২০২৬ সালে এসেও ওয়ার্ডপ্রেস শেখা কেন এখনও আপনার জন্য সেরা সিদ্ধান্ত?
প্রতি বছরই কেউ না কেউ বলে, “ওয়ার্ডপ্রেস তো শেষ”। নতুন একটা টুল আসে, নতুন একটা AI ফিচার ভাইরাল হয়, আর সাথে সাথে আলোচনা শুরু হয় – “এখন আর ওয়ার্ডপ্রেস শিখে লাভ নেই।”
কিন্তু সংখ্যাগুলো ঠিক উল্টো কথা বলে।
২০২৬ সালে এসেও পুরো ইন্টারনেটের প্রায় অর্ধেক ওয়েবসাইট চলছে ওয়ার্ডপ্রেস দিয়ে। শুধু CMS দিয়ে বানানো সাইটের কথা বলছি না – সব ধরনের ওয়েবসাইট মিলিয়ে এই হিসাব।
আপনি যদি একজন নতুন ফ্রিল্যান্সার বা স্টুডেন্ট হন এবং দ্বিধায় থাকেন “এই AI-এর যুগে ওয়ার্ডপ্রেস শিখব, নাকি অন্য কিছু?” – তাহলে এই পোস্টটা আপনার জন্যই। চলুন আবেগ দিয়ে নয়, ডেটা আর বাস্তবতা দিয়ে বিষয়টা বুঝি।
ওয়ার্ডপ্রেস শেখার পাশাপাশি ওয়েবসাইট সুরক্ষিত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিয়মিত ওয়ার্ডপ্রেস সাইট ব্যাকআপ রাখা শিখে নেওয়া উচিত। আর যারা শুধু ওয়ার্ডপ্রেস নয়, পুরো ওয়েব ডিজাইন ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছেন, তাদের জন্য কীভাবে ওয়েব ডিজাইন শিখবেন পোস্টটিও সহায়ক হবে।
ওয়ার্ডপ্রেস আসলে কি?
একদম শুরু থেকে বলি। ওয়ার্ডপ্রেস হলো একটি ফ্রি ও ওপেন-সোর্স CMS (Content Management System) – অর্থাৎ একটি সফটওয়্যার যা দিয়ে আপনি কোডিং কম জেনেও সুন্দর, ফাংশনাল ওয়েবসাইট বানাতে পারবেন।
ব্লগ, বিজনেস ওয়েবসাইট, পোর্টফোলিও, অনলাইন স্টোর, এমনকি বড় কোম্পানির ওয়েবসাইট – সবই ওয়ার্ডপ্রেস দিয়ে বানানো সম্ভব। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর বিশাল প্লাগইন আর থিমের ইকোসিস্টেম, যা দিয়ে প্রায় যেকোনো ফিচার অল্প সময়েই যোগ করা যায়।
২০২৬ সালে ওয়ার্ডপ্রেসের অবস্থা – সংখ্যা কী বলছে?
আবেগ বাদ দিয়ে শুধু ডেটার দিকে তাকাই:
২০১৪ সালে এই শেয়ার ছিল মাত্র ২১%। গত এক দশকে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। মাঝে কয়েক বছর প্রবৃদ্ধি কিছুটা থেমেছে ঠিকই, কিন্তু শেয়ার এখনও ওই ৪২–৪৩%-এর আশেপাশেই স্থিতিশীল আছে।
এই সংখ্যাটা একজন ফ্রিল্যান্সারের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ যত বেশি সাইট ওয়ার্ডপ্রেসে, তত বেশি সেই সাইটগুলো বানানো, ঠিক করা, অপটিমাইজ করা আর মেইনটেইন করার কাজ। মানে – কাজের চাহিদা।
AI তো সব বদলে দিচ্ছে, ওয়ার্ডপ্রেস কি তাহলে পিছিয়ে পড়ছে?
২০২৬ সালে ওয়ার্ডপ্রেসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে যুক্তিটা শোনা যায়, তা হলো – “AI সব বদলে দিচ্ছে, ওয়ার্ডপ্রেস পুরোনো প্রযুক্তি, এটা টিকতে পারবে না।”
বাস্তবতা ঠিক উল্টো।
গত ২০ মে ২০২৬ তারিখে রিলিজ হয়েছে WordPress 7.0 (কোডনেম “Armstrong”) – যা বছরের সবচেয়ে বড় আপডেট। (অনেকে শুনে থাকতে পারেন এটা এপ্রিলে আসার কথা ছিল; দেরি হয়ে শেষ পর্যন্ত মে মাসে এসেছে।)
এই ভার্সনের সবচেয়ে বড় চমক হলো – AI এখন ওয়ার্ডপ্রেসের কোরেই যুক্ত হয়ে গেছে। আগে AI ব্যবহার করতে আলাদা প্লাগইন লাগত; এখন কোরের ভেতরেই থাকছে একটি স্ট্যান্ডার্ড সিস্টেম, যার নাম WP AI Client।
WordPress 7.0-তে নতুন যা যা এসেছে:
গত দুই দশকে ওয়ার্ডপ্রেস প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে আপডেট করেছে – রেসপন্সিভ ডিজাইন, মোবাইল-ফার্স্ট, REST API, হেডলেস আর্কিটেকচার, JavaScript ফ্রেমওয়ার্কের জোয়ার। এখন AI-কেও তেমনিভাবে নিজের ভেতরে নিয়ে নিচ্ছে। প্যাটার্নটা পরিষ্কার: প্ল্যাটফর্মটা প্রতিবারই মানিয়ে নেয় আর সামনে এগোয়।
নতুন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কেন ওয়ার্ডপ্রেস শেখা এখনও worth it?
এবার আসল প্রশ্নে আসি। একজন নতুন মানুষ হিসেবে, যিনি অনলাইনে আয় করতে চান – তার জন্য ওয়ার্ডপ্রেস শেখা কেন এখনও দারুণ সিদ্ধান্ত?
আমার নিজের কথাই বলি – ২০১৫ সাল থেকে আমি Fiverr-এ ওয়েব ডিজাইনার ও ওয়ার্ডপ্রেস ডেভেলপার হিসেবে কাজ করছি এবং এ পর্যন্ত ৯৫০+ প্রজেক্ট কমপ্লিট করেছি। এই পুরো ক্যারিয়ারটাই গড়ে উঠেছে মূলত ওয়ার্ডপ্রেস স্কিলের উপর ভর করে।
সত্যি কথা – ওয়ার্ডপ্রেসেরও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে
আমি আপনাকে শুধু ভালো দিকটা দেখিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাই না। ওয়ার্ডপ্রেসেরও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ আছে, যেগুলো আগে থেকে জানা থাকলে আপনি ভালো করবেন:
সোজা কথায় – ওয়ার্ডপ্রেস কোনো শর্টকাট নয়, এটা একটা প্রফেশনাল টুল। যে ঠিকভাবে শেখে, তার হাতে এটা এমন রেজাল্ট দেয় যা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম দিতে পারে না।
WooCommerce – একটু এগিয়ে থাকতে চাইলে ই-কমার্সও শিখুন
ওয়ার্ডপ্রেস শেখার পর আরেকটু এগিয়ে থাকতে চাইলে WooCommerce শিখে নিতে পারেন। এটি ওয়ার্ডপ্রেসের ফ্রি ই-কমার্স প্লাগইন, যা দিয়ে যেকোনো সাইটকে অনলাইন স্টোরে রূপ দেওয়া যায়।
বিশ্বজুড়ে অনলাইন স্টোরের একটা বড় অংশই (প্রায় ৩০–৩৮%) চলে WooCommerce-এ। আর বাংলাদেশেও ই-কমার্স ও SME ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে – মানে এই স্কিলের চাহিদাও বাড়ছে। সাধারণ ওয়েবসাইটের চেয়ে ই-কমার্স প্রজেক্টের রেটও বেশি হয়। তাই WooCommerce আপনার আয়ের আরেকটা দরজা খুলে দিতে পারে।
AI আপনার কাজ কেড়ে নেবে না, বরং সহজ করবে
অনেক নতুন ফ্রিল্যান্সার ভয় পান “AI তো নিজেই ওয়েবসাইট বানিয়ে দিচ্ছে, তাহলে আমার কাজ থাকবে তো?”
এই ভয়টা স্বাভাবিক, কিন্তু বাস্তবতা একটু আলাদা। AI এখন পর্যন্ত যা করে, তা হলো কাজকে দ্রুত করে দেয় – পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করে না। যেমন:
কিন্তু ক্লায়েন্টের আসল চাহিদা বোঝা, ডিজাইনের রুচি, সমস্যা সমাধানের বুদ্ধি, আর সবকিছু সুন্দরভাবে জোড়া দেওয়া – এগুলো এখনও মানুষের কাজ। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো AI-কে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে নিজের সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা। যে ফ্রিল্যান্সার AI-কে কাজে লাগাতে শিখবে, সে পিছিয়ে পড়া ফ্রিল্যান্সারদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে।
কীভাবে শুরু করবেন? (ধাপে ধাপে)
পরিকল্পনা ছাড়া শুরু করলে মাঝপথে হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। তাই একটা সহজ রোডম্যাপ দিচ্ছি:
ভয় না পেয়ে নিয়মিত প্র্যাকটিস করলে যে কেউ, পড়াশোনা যাই হোক না কেন – ওয়ার্ডপ্রেস শিখে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে পারে।
একটু সাহায্য দরকার? একদম শুরু থেকে ওয়েব ডিজাইন ও ওয়ার্ডপ্রেস শিখে কীভাবে Fiverr-এ ক্যারিয়ার গড়বেন – সবকিছু গুছিয়ে বাংলায় শেখানো হয়েছে আমাদের WordPress Pro কোর্সে। আগে নিজের পোর্টফোলিও সাইট বানাতে চাইলে Build Portfolio Website, আর Fiverr-এ ভালো করতে চাইলে Fiverr Success কোর্সটি দেখতে পারেন। শুরু করার জন্য ফ্রি HTML ও cPanel কোর্সও আছে।
শেষ কথা
ওয়ার্ডপ্রেস “শেষ হয়ে যাচ্ছে” – এই কথাটা গত দশ বছর ধরে শোনা যাচ্ছে। অথচ প্রতিবারই এটি আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। ২০২৬ সালেও তাই, AI-কে নিজের ভেতরে নিয়ে এটি আরও আধুনিক হয়েছে।
একজন নতুন ফ্রিল্যান্সারের জন্য বাস্তব কথাটা হলো – চাহিদা আছে, কাজ আছে, শুরু করা সহজ, আর সঠিকভাবে শিখলে আয়ের সুযোগও অনেক। শুধু মনে রাখবেন, ওয়ার্ডপ্রেস কোনো শর্টকাট নয়; ধৈর্য নিয়ে স্কিলটা গড়ে তুললে তবেই ফল পাবেন।
পোস্টটি ভালো লাগলে অবশ্যই বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন। হয়তো আপনার একটি শেয়ারের মাধ্যমে কেউ অনলাইন ক্যারিয়ার গড়ার সঠিক দিকনির্দেশনা খুঁজে পাবে।
কোডারস ফাউন্ডেশন এর সাথে আপনার শেখা আনন্দময় হোক।