ফুটার ডিজাইন: ওয়েবসাইটের সবচেয়ে অবহেলিত অংশ যেভাবে সাজাবেন
ফুটার নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। বেশিরভাগ ওয়েবসাইটে ফুটার মানে একটাই লাইন, “© ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।” ব্যস, দায়িত্ব শেষ। অথচ ফুটার ডিজাইন ঠিকঠাক করলে এটাই হতে পারে সাইটের সবচেয়ে কাজের একটা জায়গা।
ভিজিটর যখন একটা পেজ পুরোটা স্ক্রল করে নিচে নামে, তার মানে সে আগ্রহ পেয়েছে। ঠিক এই মুহূর্তে যদি তাকে পরের ধাপে যাওয়ার একটা পথ না দেখানো যায়, পুরো স্ক্রলটাই বৃথা যায়। ভিজিটর ট্যাব বন্ধ করে চলে যায়, দ্বিতীয়বার আর ফেরে না।
ফুটারকে অবহেলা করা কেন বড় ভুল
বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার আর এজেন্সি হেডার এবং হিরো সেকশনে যত সময় দেয়, ফুটারে তার সিকিভাগও দেয় না। যুক্তি থাকে, ভিজিটর তো পেজের শেষে পৌঁছেই গেছে, এখন আর কী বিক্রি করব।
এই যুক্তিটাই ভুল। যে ভিজিটর ফুটার পর্যন্ত পৌঁছায়, সে আসলে সবচেয়ে আগ্রহী ভিজিটরদের একজন। সে কনটেন্ট পড়েছে, প্রোডাক্ট দেখেছে, সিদ্ধান্তের কাছাকাছি চলে এসেছে। ফুটার তাকে হয় পরের পদক্ষেপে নিয়ে যাবে, নয়তো একদম হারিয়ে ফেলবে।
একটা কার্যকর ফুটারে যা যা থাকা দরকার
ফুটার সাজানোর কোনো জাদুবিদ্যা নেই। কিছু নির্দিষ্ট উপাদান ঠিকমতো রাখলেই এটা কাজে লাগে।
এই পাঁচটা ঠিকঠাক থাকলে ফুটার আর শুধু সাইটের শেষ চিহ্ন হয়ে থাকে না, একটা সেকেন্ড চান্স হয়ে দাঁড়ায়। CTA বাটন ডিজাইন গাইডে আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে ভুল কল-টু-অ্যাকশন পুরো কনভার্শন নষ্ট করে দেয়, ফুটারের ছোট CTA-তেও একই নিয়ম খাটে।
সবচেয়ে বড় ভুল: ফুটারে সব কিছু গুঁজে দেওয়া
ফুটার খালি রাখা যেমন ভুল, ফুটারে পুরো ওয়েবসাইটের সাইটম্যাপ কপি করে দেওয়াও ঠিক ততটাই ভুল। কিছু সাইটে দেখা যায় বিশ-ত্রিশটা লিংক, চার-পাঁচটা সোশ্যাল আইকন, দুইটা নিউজলেটার ফর্ম, আর একগাদা লিগ্যাল টেক্সট একসাথে গাদাগাদি করে রাখা।
ভিজিটর তখন কোনটা গুরুত্বপূর্ণ বুঝতেই পারে না। ফুটার নিজেই বিভ্রান্তির জায়গা হয়ে যায়, ঠিক যেমনটা হয় ওয়েবসাইট নেভিগেশন ডিজাইন ভুল হলে। ফুটারকে নেভিগেশনের ব্যাকআপ হিসেবে ভাবা ঠিক না, এটা আলাদা, ছোট এবং লক্ষ্যভিত্তিক একটা অংশ হওয়া উচিত।
নিয়ম সহজ, প্রতিটা কলামে সর্বোচ্চ চার থেকে ছয়টা লিংক রাখুন। কলামের সংখ্যা তিন বা চারের বেশি না রাখাই ভালো। যা ভিজিটরের কাজে লাগবে তাই রাখুন, বাকি সব বাদ দিন।
ট্রাস্ট সিগন্যাল ফুটারে কেন জরুরি
বাংলাদেশের বেশিরভাগ ভিজিটর নতুন কোনো সাইট থেকে কিছু কিনতে বা সার্ভিস নিতে দ্বিধায় থাকে। পেমেন্ট নিরাপদ কিনা, কোম্পানি আসল কিনা, এসব প্রশ্ন মাথায় ঘোরে। ফুটার এই দ্বিধা কাটানোর শেষ সুযোগ।
bKash, Nagad, বা ব্যাংক ট্রান্সফারের আইকন ফুটারে ছোট করে দেখানো ভিজিটরকে নিশ্চিত করে যে পেমেন্ট সিস্টেম চেনা এবং নিরাপদ। পাশাপাশি বছরের অভিজ্ঞতা, ক্লায়েন্ট সংখ্যা, বা রিভিউয়ের একটা ছোট লাইন থাকলে সেটা আরেক ধাপ আস্থা বাড়ায়। এসব জাঁকজমকভাবে না দেখিয়ে ছোট এবং সৎভাবে দেখানোই সবচেয়ে কার্যকর।
মোবাইলে ফুটার: অ্যাকর্ডিয়ন প্যাটার্নই সবচেয়ে ভালো কাজ করে
ডেস্কটপে চার কলামের ফুটার সুন্দর দেখালেও মোবাইলে সেটা এক লম্বা লিস্ট হয়ে যায়। ভিজিটর স্ক্রল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ফুটার শেষ হওয়ার আগেই ছেড়ে চলে যায়।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ ট্রাফিক মোবাইল থেকে আসে, তাই এই সমস্যাটা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটা কলামকে মোবাইলে অ্যাকর্ডিয়ন আকারে ভাঁজ করে রাখলে ফুটার ছোট এবং পরিষ্কার থাকে, ভিজিটর যেই অংশ দরকার সেটাই খুলে দেখে নিতে পারে। Kadence বা Elementor দুই জায়গাতেই এই প্যাটার্ন সহজে বানানো যায়।
নিজের সাইটের ফুটার যেভাবে অডিট করবেন
নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে যে কেউ নিজের ওয়েবসাইটের ফুটার কয়েক মিনিটেই যাচাই করতে পারে।
- ফুটারে যোগাযোগের তথ্য (ফোন, ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ) সরাসরি দেখা যাচ্ছে কিনা যাচাই করুন
- প্রতিটা কলামের লিংক গুনুন, চারটার বেশি হলে গ্রুপ করে ছোট করুন
- পেমেন্ট আইকন বা ট্রাস্ট সিগন্যাল আছে কিনা দেখুন, না থাকলে যোগ করুন
- মোবাইলে সাইট খুলে ফুটার পর্যন্ত স্ক্রল করে দেখুন, কোথাও লেআউট ভেঙে যাচ্ছে কিনা
- কপিরাইট লাইনে বছর ম্যানুয়ালি লেখা থাকলে সেটা ডায়নামিক করে দিন, নাহলে পরের বছর পুরোনো তারিখ থেকে যাবে
এই পাঁচটা ধাপ শেষ করতে পনেরো মিনিটও লাগবে না, কিন্তু ফলাফল দীর্ঘমেয়াদে কনভার্শন রেটে দেখা যায়।
শেষ কথা
১০+ বছর ধরে ওয়ার্ডপ্রেস সাইট বানানো এবং ৯৫০+ Fiverr ক্লায়েন্ট প্রজেক্ট করার অভিজ্ঞতা থেকে একটা প্যাটার্ন বারবার চোখে পড়ে, যেসব সাইট ভালো কনভার্ট করে তাদের ফুটার কখনো অবহেলিত থাকে না। এটা সবসময় হেডারের মতোই যত্ন নিয়ে বানানো একটা অংশ।
নিজে ফুটার ঠিক করার সময় বা দক্ষতা না থাকলে পেশাদারভাবে করাতে চাইলে ল্যান্ডিং পেজ ডিজাইন সার্ভিস থেকে হেডার থেকে ফুটার পর্যন্ত পুরো পেজ ডিজাইন করিয়ে নেওয়া যায়। আর নিজে ওয়ার্ডপ্রেসে ফুটার, মেনু এবং পুরো সাইট ঠিকভাবে সাজাতে শিখতে চাইলে ওয়ার্ডপ্রেস প্রো কোর্স থেকে পুরো প্রসেসটা প্র্যাকটিক্যালি শেখা যায়।